আন্তর্জাতিক শ্রমিক সমিতি (IWA)-র আত্মপ্রকাশের ইতিহাস

নিক হিথের লেখা '১৯২২ সালে আন্তর্জাতিক শ্রমিক সমিতি প্রতিষ্ঠা' বিষয়ক নিবন্ধটি ২০২২ সালের গ্রীষ্মকালীন ব্ল্যাক ফ্ল্যাগ অ্যানার্কিস্ট রিভিউ-তে ইংরেজিতে প্রকাশিত হয়। বাংলাভাষী পাঠকদের জন্য এর একটি ভাবানুবাদ তুলে ধরা হলো।

Share
আন্তর্জাতিক শ্রমিক সমিতি (IWA)-র আত্মপ্রকাশের ইতিহাস

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সংগঠিত শোষণবিরোধী শ্রমিকদের—যারা রেভ্যুলেশনারী সিন্ডিক্যালিস্ট ও নৈরাজ্যবাদী হিসেবে পরিচিত ছিল—তাদের একটি  বহু আকাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য ছিল শ্রমিক শ্রেণীর একটি আন্তর্জাতিক সংগঠন গড়ে তোলা। অবশেষে, ১৯২২ সালে বার্লিনে ‘আন্তর্জাতিক শ্রমিক সমিতি’ বা ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্কার্স অ্যাসোসিয়েশন (IWA)-এর আত্মপ্রকাশ ঘটে, যা বিশ্বের এই বিপ্লবী শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন পূরণ করেছিল।

এর আগে, কার্ল মার্ক্স ও তাঁর অনুসারীদের সাথে বাকুনিন এর সমর্থকদের, বেলজিয়ার সমাজতান্ত্রিক এবং ব্রিটিশ ট্রেড ইউনিয়নের মতো বিরোধী দলগুলোর মধ্যকার দ্বন্দ্বের কারণে ১৮৭৫ সালে ফিলাডেলফিয়া সম্মেলনে ‘প্রথম আন্তর্জাতিক সংগঠন’-এর কার্যক্রম স্থগিত করা হয় এবং পরের বছরের জুলাই মাসে তা আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। এছাড়া, ১৮৭২ সালে সুইজারল্যান্ডের সেন্ট ইমিয়ারে যে তথাকথিত ‘স্বৈরাচার-বিরোধী আন্তর্জাতিক’ সংগঠন গঠিত হয়েছিল, তাও ১৮৭৭ সালের মধ্যে ভেঙে পড়ে। ফলে, অনেক বিপ্লবী সিন্ডিক্যালিস্ট নতুন একটি আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংগঠন এর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতে শুরু করেন। বিশেষ করে, ১৮৮৯ সালে সামাজ-গণতান্ত্রিক (সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক) দলগুলো যখন তাদের নিজেদের আন্তর্জাতিক সংগঠন অর্থাৎ ‘দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক’ তৈরি করে, তখন এই তাগিদ আরও বাড়ে। সংস্কারপন্থি ট্রেড ইউনিয়নগুলোও ‘ন্যাশনাল ট্রেড ইউনিয়ন সেন্টারগুলির আন্তর্জাতিক সচিবালয়’ (ISNTUC) নামে ১৯০১ সালে তাদের নিজস্ব আন্তর্জাতিক সংগঠন তৈরী করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কারণে এটি ভেঙে গেলে, সংস্কারপন্থি ইউনিয়নগুলো ১৯১৯ সালের জুলাই মাসে আমস্টারডামে এক কংগ্রেসের মাধ্যমে ‘ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অফ ট্রেড ইউনিয়নস’ (IFTU) গঠন করে। এতে যুক্তরাষ্ট্র, বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, জার্মানি, ফ্রান্স, গ্রেট ব্রিটেন, হল্যান্ড, লুক্সেমবার্গ, নরওয়ে, অস্ট্রিয়া, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড, স্পেন এবং চেকোস্লোভাকিয়ার ইউনিয়নগুলো একত্রিত হয়। এটি ১ কোটি ৭০ লক্ষ শ্রমিকের প্রতিনিধিত্ব করেছিল এবং এর মূল ঝোঁক ছিল সমাজতন্ত্রের সংস্কারপন্থি ধারার দিকে।

১৯ শতকের শেষভাগে এবং ২০ শতকের শুরুর দিকে প্রথম গণ-বিপ্লবী সিন্ডিক্যালিষ্ট, অ্যানার্কো-সিন্ডিক্যালিষ্ট এবং শিল্পভিত্তিক শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর জন্ম হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল—১৯০৫ সালে গঠিত ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ (IWW), আর্জেন্টিনার শ্রমিক আঞ্চলিক ফেডারেশন (FORA), ১৮৯৫ সালে ফ্রান্সে গঠিত সাধারণ শ্রম কনফেডারেশন (CGT), ইতালির ‘ইউনিয়নে সিন্ডিক্যালে ইতালিয়ানা’ (USI), ১৯১০ সালে গঠিত সুইডিশ সংগঠন (SAC), ডাচ শিল্প ফেডারেশনসমূহ এবং ১৯১০ সালে স্পেনে গঠিত CNT।

১৯১৩ সালের আন্তর্জাতিক সিন্ডিকালিস্ট সম্মেলন

এই বিভিন্ন ইউনিয়নগুলোকে একত্রিত করে একটি নতুন আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংগঠন গঠনের প্রথম প্রচেষ্টাটি ১৯১৩ সালে লন্ডনে অনুষ্ঠিত হয়। ডাচ জাতীয় শ্রম সচিবালয় (NAS) এবং ব্রিটিশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিন্ডিক্যালিষ্ট এডুকেশন লিগ (ISEL)-এর উদ্যোগে ১৯১৩ সালের ২৭শে সেপ্টেম্বর থেকে ২রা অক্টোবর পর্যন্ত হোলবর্ন টাউন হলে এই আন্তর্জাতিক সিন্ডিক্যালিস্ট সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। CNT-এর পূর্বসূরি কাতালুনিয়ার ‘সোমিয়ারিদাদ ওব্রেরা’ (শ্রমিক সংহতি) এই উদ্যোগকে সমর্থন করেছিল। তবে, ফরাসি CGT এই সম্মেলন আয়োজনের বিরোধিতা করে। কারণ, তারা তখনও ISNTUC-এর সাথে যুক্ত ছিল এবং ভয় পেয়েছিল যে, নৈরাজ্যবাদী ও বিপ্লবী সিন্ডিক্যালিষ্ট অংশের চাপে তাদের সংস্কারপন্থি অংশটি শক্তিশালী হওয়ার বদলে ভেতরে ভেতরে কোন্দলে জড়িয়ে পড়তে পারে।

যাইহোক, ১৯১৩ সালে লন্ডনে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে ৬৫টি সংগঠনের প্রতিনিধিত্বকারী ৩৮ জন প্রতিনিধি একত্রিত হয়ে নিম্নলিখিত প্রস্তাবটি পাস করেন:

প্রথম আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংঘবাদী সম্মেলন থেকে আমরা এবিষয়ে একমত হয়েছি যে, সকল দেশের শ্রমিকেরা রাষ্ট্র ও শোষণমূলক পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মাধ্যমে একই ধরনের দমন-পীড়নের শিকার হয়। একারণে, এই সম্মেলনটি শ্রমিকদের পক্ষের সংগ্রাম, আন্তর্জাতিক সংহতি এবং শ্রমিকদের স্বাধীন বিকেন্দ্রীভূত ছোট ছোট সংঘ-ভিত্তিক সংগঠনের পক্ষে। এটি পুঁজিবাদ ও রাষ্ট্রের সম্পূর্ণ ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত শ্রমিকদের তাৎক্ষণিক প্রয়োজনীয় স্বার্থের পক্ষে কাজ করে। সম্মেলন থেকে আমরা আরও ঘোষণা করি যে, উৎপাদন ও বিতরণের মাধ্যমগুলোর ব্যক্তিগত মালিকানার অনিবার্য পরিণতি হলো এই শ্রমিক পক্ষের সংগ্রাম, এবং তাই আমরা এই সম্মেলন থেকে  উক্ত মাধ্যমগুলোকে সামাজিক মালিকানাধীন (সোশালাইজড) করার দাবি জানাই।

এই লক্ষ্যে ট্রেড ইউনিয়নগুলোর গঠন ও বিকাশ এমনভাবে পরিচালিত হওয়া উচিত যাতে তারা পুরো সমাজের কল্যাণে পণ্য উৎপাদন ও বিতরণ নিশ্চিত করার জন্য যোগ্য ও উপযুক্ত হয়।

সম্মেলন এই মর্মে নিশ্চিত হয় যে, শ্রমিকরা যদি রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মতপার্থক্যে বিভক্ত
থাকে, তবে আন্তর্জাতিক ইউনিয়নগুলো সফলভাবে শ্রেণি সংগ্রাম পরিচালনা করতে পারবে না। শ্রমিকরা রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মতপার্থক্যের কারণে বিভক্ত থাকলে আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলো সফলভাবে শ্রমিক পক্ষের সংগ্রাম পরিচালনা করতে পারে না—এই বিষয়টি যাচাই করে এই সম্মেলন ঘোষণা করছে যে, শ্রেণি সংগ্রামের প্রকৃত রূপ কেবল অর্থনৈতিকই হতে পারে। এর জন্য শ্রমিক সংগঠনগুলোর উচিত নয় সরকারের বা তাদের সহযোগীদের সাথে আপস করে কোনো লক্ষ্য অর্জন করা; বরং তাদের কেবল নিজেদের সংগঠনের শক্তি এবং প্রত্যক্ষ সংগ্রামের (ডাইরেক্ট অ্যাকশন) ওপর ভরসা রাখা উচিত। অতএব, এই ঘোষণার ফলস্বরূপ, রাষ্ট্র ও পুঁজিবাদের নিপীড়ন থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি পেতে আন্তর্জাতিক সংহতির ভিত্তিতে স্বাধীন, সমবায়ভিত্তিক ও শিল্পভিত্তিক সংগঠনে ঐক্যবদ্ধ হতে বিশ্বের সকল দেশের শ্রমিকদের প্রতি এই সম্মেলন থেকে আমরা আহ্বান জানাই।

এইভাবে, বিপ্লবী শ্রমিক সংঘবাদের নীতিসমূহ, যেমন শ্রমিক শ্রেণীর সংগ্রামের প্রতি নিবেদিত, আন্তর্জাতিক সংহতি, সম্পত্তির সামাজিকীকরণ এবং পুঁজিবাদ ও রাষ্ট্রের বিলোপ, সংসদীয় কার্যকলাপের প্রত্যাখ্যান, এবং প্রত্যক্ষ কর্মের মাধ্যমে অর্থনৈতিক স্তরে সংগ্রাম—এই নীতিগুলো সম্মেলনে গৃহীত হয়েছিল। এবং এই ধারা অব্যাহত রাখতে সিদ্ধান্ত হয়েছিল যে পরের বছর আরেকটি সম্মেলনের আয়োজন করা হবে।

কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ায় সেই পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। যুদ্ধ শেষ হলে NAS নতুন একটি সম্মেলন ডাকার আহ্বান জানিয়ে একটি বিজ্ঞপ্তি পাঠায়। কিন্তু ডাচ, সুইডিশ এবং ড্যানিশ সরকারগুলোর বাধার কারণে সেই সম্মেলন আয়োজনের প্রতিটি প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংঘবাদী আন্দোলনে নানা সংকট ডেকে আনে। ফরাসি CGT (পিয়ের মোনাত ও আলফোনস মেরেইমের ছোট একটি বিপ্লবী সংখ্যালঘু দল ছাড়া) যুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নেয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে IWW-এর ওপর চরম দমন-পীড়ন চালানো হয়, এবং USI-এর ভেতরে যুদ্ধকে সমর্থন করা নিয়ে তীব্র কোন্দল শুরু হয়—যার সমাপ্তি ঘটে যুদ্ধপন্থি অংশটিকে আন্তর্জাতিক সংগঠন থেকে বাদ দিয়ে একটি স্পষ্ট শ্রমিকদের স্বার্থের নৈরাজ্যবাদী ও আন্তর্জাতিকতাবাদী অবস্থান গ্রহণের মধ্য দিয়ে। এছাড়া রুশ বিপ্লবের প্রভাবের কারণেও নানামুখী সমস্যার সৃষ্টি হয়।

আন্তর্জাতিক লাল শ্রমিক ইউনিয়ন

১৯১৭ সালে রাশিয়ায় বলশেভিকরা ক্ষমতা দখলের পর ১৯১৯ সালে তৃতীয় আন্তর্জাতিক সংগঠন (যা রুশ সংক্ষিপ্ত নামে ‘কমিন্টার্ন’ নামে পরিচিত) গঠিত হয়, যা মস্কোর নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন কমিউনিস্ট পার্টিকে সংগঠিত করে। এর পাশাপাশি, ১৯২১ সালের জুলাই মাসে ‘রেড ইন্টারন্যাশনাল অফ লেবার ইউনিয়নস’ (RILU) গঠিত হয়, যা রুশ সংক্ষিপ্ত নামে ‘প্রফিন্টার্ন’ নামেও পরিচিত ছিল। সোভিয়েত নেতৃত্ব বিশ্বজুড়ে সেই সমস্ত ট্রেড ইউনিয়নগুলোকে একত্রিত করতে চেয়েছিল যারা আমস্টারডাম ইন্টারন্যাশনালাইজড IFTU-এর বিরোধী ছিল। তারা কমিউনিস্ট নিয়ন্ত্রিত শ্রমিক সংগঠন, বিপ্লবী শ্রমিক সংঘবাদী ও শ্রমিক–সংঘবাদী ইউনিয়ন, আমস্টারডাম ইউনিয়নের ভেতরের বিপ্লবী বিরোধী দল এবং বিশ্বজুড়ে উপনিবেশ-বিরোধী আন্দোলনগুলোকে এক জোটে আনতে কাজ করে। এর মাধ্যমে তারা এই বৈচিত্র্যময় গোষ্ঠীগুলোর ওপর নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে এবং কমিউনিস্ট দলগুলোর জন্য সদস্য সংগ্রহ করতে চেয়েছিল।

শুরুতে USI, CNT, কিছু ফরাসি ইউনিয়ন এবং FORA-র ভেতরের কিছু ধারা RILU-কে সমর্থন করেছিল। উদাহরণস্বরূপ, ১৯১৯ সালের ডিসেম্বরে মাদ্রিদে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় কংগ্রেসে CNT তৃতীয় আন্তর্জাতিক সংগঠনে যোগদানের সপক্ষে এই প্রস্তাব পাস করে:

“জাতীয় শ্রম কনফেডারেশন (CNT) নিজেকে বাকুনিন সমর্থিত প্রথম আন্তর্জাতিক সংগঠনের উল্লেখিত নীতিগুলোর এক দৃঢ় রক্ষক বলে ঘোষণা করে। এটি ঘোষণা করছে যে, স্পেনে আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজিত ও অনুষ্ঠিত হওয়া পর্যন্ত, যা শ্রমিকদের প্রকৃত আন্তর্জাতিক কীভাবে পরিচালিত হবে তার ভিত্তি স্থাপন করবে, সেই পর্যন্ত এটি তৃতীয় আন্তর্জাতিক সংগঠন এর বিপ্লবী চরিত্রের কারণে সাময়িকভাবে এর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করছে।"

CNT তথ্যের সন্ধানে মস্কোয় প্রতিনিধি দল পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়। তবে তাদের মধ্যে কেবল একজনই সেখানে পৌঁছাতে পেরেছিলেন—তিনি হলেন আনহেল পেস্তানা (Angel Pestaña)। তিনি ১৯২০ সালের গ্রীষ্মে তৃতীয় আন্তর্জাতিক সংগঠন এর দ্বিতীয় সম্মেলনে যোগ দেন। পেস্তানা বলশেভিকদের উদ্ধত ও আধিপত্যবাদী মনোভাব দেখে সন্দেহ প্রকাশ করতে শুরু করেন। বলশেভিক শ্রমিক ইউনিয়ন নেতা সলোমন লজোভস্কি জোর দিয়ে বলেন যে বিপ্লবীদের সংস্কারপন্থি ট্রেড ইউনিয়নগুলো ছেড়ে যাওয়া উচিত নয়। পেস্তানা এবং জার্মান নৈরাজ্য শ্রমিক সংঘবাদীরা আউগুস্ট সুচি (Augustin Souchy) এর তীব্র বিরোধিতা করেন। বিপ্লবী শ্রমিক সংঘবাদী সংগঠনগুলোকে বিভিন্ন কমিউনিস্ট পার্টির অধীনে নতিস্বীকার করানোর নীতিরও প্রতিবাদ জানানো হয়।

বিপ্লবী সিন্ডিক্যালিষ্ট সংগঠনগুলোকে সংখ্যালঘু সংগঠন হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়। এরপর ১৯২১ সালের ১৫ই জুলাই আন্তর্জাতিক ট্রেড ইউনিয়নবাদী ও সিন্ডিক্যালিষ্টদের তাড়াহুড়ো করে ডাকা প্রথম কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। পরবর্তী অভিজ্ঞতাগুলো পেস্তানা এবং USI প্রতিনিধি, নৈরাজ্যবাদী আরমান্দো বোরঘিকে এই বিশ্বাসে উপনীত করে যে সিন্ডিক্যালিষ্ট ও বলশেভিকদের মধ্যে পার্থক্য অত্যন্ত গভীর। এর ফলে আগস্টের শেষ বা সেপ্টেম্বরের শুরুতে তারা রাশিয়া ত্যাগ করেন।

অক্টোবরে পেস্তানা বার্লিনে জার্মান সিন্ডিক্যালিষ্টদের সাথে দীর্ঘ আলোচনা করেন এবং এরপর ইতালি চলে যান। তবে সেখানে তাকে আটক করা হয় এবং দুই মাস পর স্পেনে নির্বাসিত করা হয়। বার্সেলোনায় পৌঁছানোর সাথে সাথেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং পুরো ১৯২১ সাল তাকে জেলেই কাটাতে হয়। এর ফলে বলশেভিক সরকার সম্পর্কে তার মতামত CNT জানতে পারেনি।

ফলস্বরূপ, CNT একটি সম্মেলন ডেকে ১৯২১ সালের জুনে তৃতীয় আন্তর্জাতিক সংগঠনের তৃতীয় সম্মেলনে নতুন প্রতিনিধি দল পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়। এই দলে ছিলেন—আন্দ্রেউ নিন, জোয়াকিন মাউরিন, জেসুস ইবানেজ, হিলারিও আরল্যান্ডিস এবং গাস্তন লেভাল। এরা RILU-এর প্রথম সম্মেলনে অংশ নেন। এই সম্মেলন বলশেভিকদের একাধিপত্য স্পষ্ট করে। তাগানকা কারাগারে অনশনরত নৈরাজ্যবাদী বন্দীদের নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হলে বলশেভিকরা তাদের দেশ থেকে বিতাড়িত করতে বাধ্য হয়। ট্রটস্কি ও বুখারিদ দুজনেই রাশিয়ান নৈরাজ্যবাদীদের “পেটি-বুর্জোয়া” ও “প্রতিক্রিয়াশীল” বলে আক্রমণ করায় উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়। রাশিয়ান নৈরাজ্যবাদী সিন্ডিক্যালিষ্টদের পক্ষে কথা বলার জন্য আলেকজান্ডার শাপিরোকে বক্তব্য রাখার অনুমতি দেওয়া হয়নি।

CNT-এর ভেতরে বলশেভিকপন্থি ও বলশেভিক-বিরোধী অংশগুলোর মধ্যে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়। নৈরাজ্যবাদীরা এবং যে সমস্ত “বিশুদ্ধ” সিন্ডিক্যালিষ্টরা যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিরোধী ছিলেন, তারা মাউরিন, নিন, ইবানেজ এবং আরল্যান্ডিসের অবস্থানের প্রতিবাদ জানান; কারণ তাদের কমিউনিস্টদের প্রতি অতিরিক্ত নমনীয় বলে অভিযুক্ত করা হয়েছিল। এর ফলে CNT-এর নৈরাজ্যবাদী চরিত্র আরও শক্তিশালী হয় এবং পরবর্তী সময়ে মাউরিন ও নিন ‘শ্রমিক মার্ক্সবাদী ঐক্য দল’ (POUM)-এর প্রতিষ্ঠাতা হয়ে ওঠেন।

এই তীব্র মতবিরোধের কারণে CNT RILU থেকে নিজেদের সম্পর্ক ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯২২ সালে পেস্তানা অবশেষে কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তার দেওয়া প্রতিবেদনের মাধ্যমে এই পদক্ষেপ আরও জোরদার হয়। ওই বছরের জুনে CNT সারাজাগোসা শহরে একটি সম্মেলন করে, যেখানে পেস্তানার সাক্ষ্য এবং গাস্তন লেভালের সমালোচনামূলক বক্তব্য CNT-কে তৃতীয় আন্তর্জাতিক সংগঠন ও RILU-এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে বাধ্য করে। অধিকাংশই একমত হয়েছিলেন যে, যদিও সিএনটি রুশ বিপ্লবকে সমর্থন করেছিল, এর অর্থ এই নয় যে এটি বলশেভিক কার্যকলাপ ও তত্ত্বকে সমর্থন করত।

তবে, ১৯১৯ সালের কংগ্রেসে যেহেতু কমিন্টার্নের প্রতি সমর্থন জানানোর সিদ্ধান্ত আগেই নেওয়া হয়েছিল, তাই CNT-এর এই সম্মেলন সেই পুরনো সিদ্ধান্ত সরাসরি বাতিল করতে পারেনি। ফলে RILU-এর সাথে সম্পর্ক সাময়িকভাবে স্থগিত করার এবং কনফেডারেশনের বিভিন্ন ইউনিয়নের ভেতরে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এদিকে CNT জার্মান সিন্ডিক্যালিষ্টদের সাথে হাত মিলিয়ে নতুন একটি ইন্টারন্যাশনাল গঠনে সচেষ্ট হয়। ফ্রান্স ও ইতালির সিন্ডিকালিস্টদের প্যারিসে একটি সম্মেলন আহ্বান করার পদক্ষেপটি এর জন্য একটি ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছিল বলে মনে হয়।

এর আগে, অক্টোবরে ডুসেলডর্ফে অনুষ্ঠিত ফ্রাইয়ে আরবাইটার ইউনিয়ন ডয়েচলান্ডস (জার্মান মুক্ত শ্রমিক ইউনিয়ন এফএইউডি)-এর সভায় জার্মান নৈরাজ্যবাদী সিন্ডিকালিস্টরা বিপ্লবী সিন্ডিকালিস্ট ইউনিয়নগুলোর মধ্যে মস্কো-বিরোধীদের ঐক্যবদ্ধ করার প্রচেষ্টা চালিয়েছিল। NAS, SAC এবং IWW-এর প্রতিনিধিরাও সেই বৈঠকে যোগ দেন এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত একটি আন্তর্জাতিক সংগঠন গড়ে তুলতে ব্যর্থ হওয়ায় RILU-এর সমালোচনা করে বার্লিনে একটি আন্তর্জাতিক সিন্ডিক্যালিষ্ট সম্মেলন ডাকার আহ্বান জানান। USI টেলিগ্রামের মাধ্যমে এই প্রস্তাবকে সমর্থন করে।

ফ্রান্সের CGT প্রথম বিশ্বযুদ্ধে সমর্থনের কারণে অনেকটাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছিল এবং যুদ্ধের সময় লিও জুহুর নেতৃত্বাধীন শীর্ষ নেতারা বিভিন্ন সরকারি কমিটির পদ গ্রহণ করেছিলেন। যুদ্ধের পরে তারা সংস্কারপন্থি অবস্থান গ্রহণ করে এবং রুশ বিপ্লবের প্রতি শত্রুভাবাপন্ন হয়ে ওঠে। এর ফলে ১৯১৯ সালের লিঁও কংগ্রেসের পর CGT-এর ভেতরে থাকা বিপ্লবী সংখ্যালঘু অংশটি ‘বিপ্লবী সিন্ডিক্যালিষ্ট কমিটি’ (CSR) গঠন করে, যা নৈরাজ্যবাদী, বিশুদ্ধ সিন্ডিক্যালিষ্ট এবং কমিন্টার্ন-সমর্থকদের একত্রিত করেছিল। CGT-এর ভেতরে ভাঙন ধরাতে CSR ছিল মূল শক্তি, যার ফলে ১৯২২ সালের জুনের শেষের দিকে CGT-U (“U” অর্থ Unitaire বা ঐক্যবদ্ধ) আত্মপ্রকাশ করে—যার প্রথম সম্মেলন ১৯২২ সালের জুনের শেষের দিকে অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

শুরুতে CGT-U-তে নৈরাজ্যবাদীদের প্রভাবই বেশি ছিল। RILU কংগ্রেসে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো CGT-U-এর ভেতরের মতপার্থক্যকে আরও বাড়িয়ে দেয়। ফলস্বরূপ, ১৯২২ সালের জুন মাসে FAUD কর্তৃক প্রস্তাবিত বার্লিন কংগ্রেসে প্রতিনিধি পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একইভাবে, FORA-ও RILU কংগ্রেস দেখে হতাশ হয় এবং অত্যন্ত উৎসাহের সাথে বার্লিন কংগ্রেসকে সমর্থন করে; পাশাপাশি টম বার্কারকে প্রকাশ্যে কঠোর সমালোচনা করে, যিনি FORA-র প্রতিনিধি হিসেবে RILU কংগ্রেসে যোগ দিয়েছিলেন। ১৯২১ সালের শেষ নাগাদ আইডব্লিউডব্লিউ (IWW) এও সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে, তারা আরআইএলইউ (RILU)-কে সদস্যপদ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারবে না।

জুনের বার্লিন সম্মেলন

১৯২২ সালের ১৬ থেকে ১৮ই জুনের বার্লিন সম্মেলনে CGT-U, SAC, NAS, FAUD, USI, CNT এবং নরওয়ের ‘নর্স্ক সিন্ডিক্যালিষ্ট ফেডারেশন’ (NSF) অংশ নেয় এবং তারা মোট ১৪ লক্ষ শ্রমিকের প্রতিনিধিত্ব করেছিল বলে উল্লেখ করে। সম্মেলনটি আলেকজান্ডার শাপিরো এবং মার্ক ম্রাচনির মতো রুশ নৈরাজ্যবাদী সিন্ডিকালিস্টদের একটি প্রতিনিধিদলকেও স্বীকৃতি দিয়েছিল, যারা রাশিয়া ছেড়ে জার্মানিতে চলে গিয়েছিলেন। সম্মেলনটি সর্বরাশিয়ান ট্রেড ইউনিয়ন কনফেডারেশনকেও আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। এই কমিউনিস্ট-নিয়ন্ত্রিত সংস্থার একজন প্রতিনিধি আন্দ্রেয়েভ সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে যথারীতি উপস্থিত হন এবং ম্রাচনির সাথে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন। তিনি লাল-সন্ত্রাস ও সর্বহারার একনায়কতন্ত্রের পক্ষে কথা বলেন এবং ম্রাচনির মন্তব্যকে সম্মেলনের দ্বারা অগ্রহণযোগ্য ঘোষণা করার দাবি জানান।

আরআইএলইউ-এর সাথে তাদের কী সম্পর্ক রাখা উচিত, তা নিয়ে দোদুল্যমান কিছু প্রতিনিধির জন্য এটি ছিল শেষ ধাক্কা। জুনের এই সম্মেলনটি পুরোপুরি সফল বলা যায় না। CGT-U প্রতিনিধি দল জানায় যে দুই সপ্তাহ পর সেন্ট এতিয়েনে তাদের নিজস্ব সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে বিধায় তারা কোনো বিষয়ে ভোট দিতে পারবে না এবং তাদের কোনো নির্দিষ্ট ম্যান্ডেট নেই। CGT-U-এর ভেতরে থাকা স্বাধীনতাপন্থি ধারাটি ক্রমবর্ধমান আক্রমণাত্মক কমিউনিস্ট সংখ্যালঘু গোষ্ঠী এবং পোনাতের আশেপাশের সিন্ডিক্যালিষ্টদের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছিল—যাদের নিজেদের দিকে টানতে RILU প্রচারণা চালাচ্ছিল। ফলে সেন্ট এতিয়েন সসম্মেলনের ফলাফল কী হবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল।

সম্মেলন ছাড়ার আগে আন্দ্রেভ সতর্ক করে দেন যে, “ফরাসি ও ইতালীয় শ্রমিক আন্দোলনকে নিজেদের নির্দেশ অনুযায়ী পরিচালিত করার জন্য RILU বর্তমান CGT-U এবং USI নেতাদের উপেক্ষা করে সরাসরি কাজ করবে।” রাশিয়ান নৈরাজ্যবাদীদের ওপর নির্যাতন নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট অবস্থান নেওয়ার বিষয়টি সম্মেলনে এড়িয়ে যাওয়া হয়। ফরাসি প্রতিনিধি দলের পক্ষে বক্তব্য রাখতে গিয়ে লুই লেকোইন এবং হেনরি টোটি উদ্বেগ প্রকাশ করেন যে CGT-U কমিউনিস্টদের কব্জায় চলে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে এবং তারা নিশ্চিত ছিলেন যে রুশরা সেন্ট এতিয়েন কংগ্রেসে প্রতিনিধি পাঠাবে। তারা অন্যান্য প্রতিনিধিদের কাছে নির্যাতন বিষয়ক কোনো প্রস্তাব না তোলার অনুরোধ জানান, যা অন্যরা অনিচ্ছাসত্ত্বেও মেনে নেন।

তুলনামূলক ইতিবাচক দিক হিসেবে, সম্মেলনটি FAUD-এর রুডলফ রকার কর্তৃক খসড়া তৈরি করা সিন্ডিক্যালিজম বিষয়ক দশ দফার ঘোষণা এবং একটি আন্তর্জাতিক ব্যুরো গঠনে সম্মত হয়। রকার মন্তব্য করেন যে, “মিথ্যা আশায় পূর্ণ ব্যক্তিদের জন্যও মস্কোর সাথে সহাবস্থান অসহনীয় হয়ে উঠবে—আমরা সময় নষ্ট করব এবং হতাশা আমাদের দলে অনুপ্রবেশ করবে”। ফলস্বরূপ, মস্কো-বহির্ভূত একটি স্বাধীন বিপ্লবী সিন্ডিক্যালিষ্ট ইন্টারন্যাশনাল গঠন করা অনিবার্য হয়ে ওঠে। RILU-র লজোভস্কি আসন্ন কংগ্রেসের নিন্দা জানিয়ে সিন্ডিক্যালিষ্টদের সংকীর্ণমনা বলে অভিযুক্ত করেন। তিনি RILU নির্বাহী আন্তর্জাতিক সিন্ডিক্যালিষ্ট ব্যুরোর সাথে সমস্ত যোগাযোগ ছিন্ন করে দেন এবং RILU-এর কার্যনির্বাহী পরিষদ আন্তর্জাতিক সিন্ডিকালিস্ট ব্যুরোর সাথে সমস্ত চিঠিপত্র আদান-প্রদান বন্ধ করে দেন।

IWA-এর প্রতিষ্ঠা

১৯২২ সালের ২৫শে ডিসেম্বর থেকে ১৯২৩ সালের ২রা জানুয়ারি পর্যন্ত বার্লিনে অনুষ্ঠিত অবৈধ সম্মেলনে ৩০ জনেরও বেশি প্রতিনিধি অংশ নেন। তারা USI, FAUD, SAC, NAS, NSF, ডেনমার্কের সিন্ডিক্যালিষ্ট প্রোপাগান্ডা ফরবুন্দ, FORA এবং মেক্সিকোর CGT-র প্রতিনিধিত্ব করেন। পর্তুগিজ CGT এবং চিলির IWA (যাদের প্রতিনিধি কংগ্রেস শেষ হওয়ার পর পৌঁছায়) IWA প্রতিষ্ঠার প্রতি তাদের সম্মতি জানায়। স্প্যানিশ CNT-এর প্রতিনিধিরা বার্লিনে পৌঁছানোর আগেই প্যারিসে গ্রেপ্তার হন। উরুগুয়ের ‘ফেডারাসিওন ওব্রেরা আঞ্চলিক উরুগুয়া’ (FORU)-র একজন প্রতিনিধিও একইভাবে দেরিতে এসে পৌঁছান।

কাউন্সিলিস্ট ইউনিয়ন AAUE, শাপিরো ও ইয়ারচুকের নেতৃত্বে রাশিয়ান সিন্ডিক্যালিষ্ট এবং চেকোস্লোভাকিয়ান ফ্রেই আর্বিটার-ইউনিয়নকে কিছু পরামর্শমূলক ভোট দেওয়া হয়। ফরাসিদের ক্ষেত্রে, সেন্ট এতিয়েন সম্মেলনে কমিউনিস্টদের ক্ষমতা দখলের পথ প্রশস্ত করেছিল, যারা পোনাত ও মনমুসো-র অনুসারী সিন্ডিক্যালিষ্টদের সাথে জোট বেঁধেছিল। এর ফলে নৈরাজ্যবাদী পিয়ের বেসনার (Pierre Besnard) RILU-র সাথে অন্তর্ভুক্তির  বিরোধী শ্রমিকদের সংগঠিত করতে ‘সিন্ডিক্যালিষ্ট ডিফেন্স কমিটি’ (CDS) গঠন করেন।

বেসনার ও ক্লোদিন লেমইন বার্লিনে CDS-এর প্রতিনিধিত্ব করলেও তারা এক নাজুক পরিস্থিতিতে ছিলেন। অধিকাংশ প্রতিনিধি দল এমন সব সংগঠনের প্রতিনিধিত্ব করছিল যারা RILU-কে বর্জন করেছিল, কিন্তু CDS ছিল CGT-U-এর ভেতরে একটি সংগঠিত সংখ্যালঘু দল যারা RILU-র সাথে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছিল। CDS গোষ্ঠীটি আশা করেছিল যে তারা এক সময় CGT-U-এর ভেতরে জয়ী হবে এবং তারা ভাঙন ধরাতে অনিচ্ছুক ছিল (যদিও মূল CGT-এর সাথে এক বছর আগেই ভাঙন ঘটেছিল) এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে শ্রমিক সংগঠনগুলোর ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছিল। ফলে বেসনার ও লেমইন নতুন কোনো বিপ্লবী সিন্ডিক্যালিষ্ট আন্তর্জাতিক সংগঠন তৈরীতে অনাগ্রহী ছিলেন।

NAS প্রতিনিধি দলের লেমইন ও ডিসেল RILU-এর সাথে আরও আলোচনার আহ্বান জানান। প্রতিনিধিরা একের পর এক উঠে এর বিরোধিতা করেন এবং জানান যে নতুন আন্তর্জাতিক সংগঠন তৈরীতে আর দেরি করা যাবে না। NAS-এর একজন ভিন্নমতাবলম্বী সদস্য বার্নার্ড ল্যানসিঙ্ক জুনিয়র উঠে জানান যে তিনি সত্যিই NAS সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাচ্ছেন, যারা গণভোটে RILU-তে যোগদান প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং নতুন আন্তর্জাতিক সংগঠনের পক্ষে রায় দিয়েছেন।

রকার মন্তব্য করেন যে আন্তর্জাতিক ব্যুরোর সাথে যোগাযোগ করা ইউরোপ ও আমেরিকার প্রতিটি সিন্ডিক্যালিষ্ট সংগঠন নতুন আন্তর্জাতিক সংগঠনের পক্ষে রয়েছে। তিনি বলেন, “আমাদের অবশেষে পরিষ্কারভাবে ঘোষণা করা উচিত: তৃতীয় আন্তর্জাতিক সংগঠন এবং RILU বিপ্লবী সর্বহারা শ্রমিকের কোনো সংগঠন নয়, তারা রুশ সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এজেন্সী।” তিনি ফরাসি ও ওলন্দাজদের সতর্ক করে দেন যে মস্কোর সাথে আপস করলে বিশ্বজুড়ে অন্যান্য বিপ্লবী সিন্ডিক্যালিষ্টদের সাথে তাদের দূরত্ব তৈরি হবে। তিনি ও অন্যান্য প্রতিনিধিরা এই বিষয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেন যে NAS নেতৃত্ব গণভোটের রায়কে উপেক্ষা করেছে।

এরপর SAC বার্লিনে সমবেত সিন্ডিক্যালিষ্টদের প্রতি RILU-এর ইন্টারন্যাশনালে যোগদানের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে একটি প্রস্তাব পেশ করে। প্রস্তাবটি পাস হওয়ার সাথে সাথে NAS প্রতিনিধিরা সম্মেলন কক্ষ ত্যাগ করেন। এরপর আর্জেন্টিনা, ডেনমার্ক, জার্মানি, ইতালি, নরওয়ে এবং সুইডেনের প্রতিনিধি দলের পক্ষ থেকে নতুন আন্তর্জাতিক সংগঠন তৈরীর আহ্বান জানিয়ে একটি প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়।

তবে ফরাসিদের সমর্থন ছিল শর্তযুক্ত। বেসনার ঘোষণা দেন যে, পুঁজিবাদ ও রাষ্ট্রকে উৎখাতে ইচ্ছুক সমস্ত বিপ্লবী শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ করার লক্ষ্য যদি নতুন আন্তর্জাতিক সংগঠনের থাকে, তবেই CDS একে সমর্থন করবে। নতুন আন্তর্জাতিকের বাইরের সংগঠনগুলোর সাথে একটি ঐক্যবদ্ধ ফ্রন্ট গঠনের চেষ্টা করা উচিত।

এই প্রস্তাবটি প্রায় সব প্রতিনিধির কাছেই গ্রহণযোগ্য ছিল, তবে CDS প্রতিনিধি দল আরও এক ধাপ এগিয়ে নতুন সচিবালয়কে RILU-র সাথে একতাবদ্ধভাবে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা দেওয়ার দাবি জানায়। ডিয়েগো আবাদ দে সান্তিলানের প্রতিনিধিত্বকারী FORA এর তীব্র বিরোধিতা করে। আর্জেন্টাইনরা বিশ্বাস করত যে, ইতালীয় ও স্প্যানিশ নৈরাজ্যবাদের উপাদানগুলোকে একত্রিত করে গঠিত ফোরা-র সাংগঠনিক রূপটি, সমাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল এবং রাজনৈতিকভাবে পরিচালিত শ্রমিক সংগঠন দ্বারা প্রভাবিত ইউরোপীয় আন্দোলনের চেয়ে, প্রথম আন্তর্জাতিক সংগঠনের মধ্যে বাকুনিন ও তার সহযোগীদের দ্বারা প্রকাশিত মূল্যবোধের একটি অধিকতর খাঁটি রূপ।

তারা স্প্যানিশ CNT-এর ভেতরের সেই অংশগুলোকে বিশেষভাবে সন্দেহ করত যারা শুরুতে RILU-তে যোগ দিয়েছিল। তারা পেস্তানা এবং সালভাদর সেগুইর মতো CNT নেতাদের মস্কোকে প্রাথমিক সমর্থনের কারণে “টিকটিকি বা গিরগিটি” বলে গণ্য করত। তাদের বিশ্বাস ছিল যে CNT প্রতিনিধিরা আটক না হলে তারা ফরাসি/NAS প্রস্তাবকে সমর্থন করত।

তারা উল্লেখ করে, “FORA গত কয়েক বছর ধরে স্পষ্টভাবে তার দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছে, এবং যদি এটি নতুন আন্তর্জাতিক সংগঠন তৈরীতে সম্মত হয়ে থাকে তবে এই বিশ্বাস নিয়ে যে সারা বিশ্বের বিপ্লবী সিন্ডিক্যালিজম বিগত বছরগুলোতে এর কাজকর্ম উপলব্ধি ও মূল্যায়ন করেছে। বিপ্লবী শ্রমিকদের নতুন আন্তর্জাতিক সংগঠন তৈরীর সিদ্ধান্তে এটি আমস্টারডাম (সোশ্যাল ডেমোক্রেট বা সমাজ-গণতন্ত্রী) এবং মস্কো (বলশেভিক কমিউনিস্ট)-এর মতো রাজনৈতিক সত্তাগুলোকে সম্পূর্ণ বর্জন করে।”

সান্তিলান RILU-র বিরোধিতায় জোরালো বক্তব্য রেখে বলেন যে সর্বহারা শ্রমিকের ঐক্য হলো একটি “অধিবিদ্যামূলক বিভ্রম” এবং CDS-এর এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া উচিত নয় যা কেবল ফরাসি শ্রমিকদের মস্কোর হাতে তুলে দেবে। তবে CDS-এর নাজুক পরিস্থিতি উপলব্ধি করে প্রতিনিধিরা বিপ্লবী ঐক্যের পক্ষে একটি প্রস্তাবে সম্মতি দেন, যেখানে FORA ভোটদানে বিরত থাকে।

জার্মান পুলিশ পাসপোর্ট তল্লাশি চালিয়ে এবং অন্তত তিনজন প্রতিনিধি সহ ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করে অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। সম্মেলনে অতীতের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে এবং প্রথম আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংগঠন এর সাথে সংযোগ স্থাপন করে এর নাম ‘আন্তর্জাতিক শ্রমিক সমিতি’ (IWA/AIT) রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। USI প্রতিনিধি এবং এর ধাতুশ্রমিক ইউনিয়নের সচিব আলব্রান্দো জিওভানেত্তির পরামর্শে এটি গৃহীত হয়। এছাড়া জুন কংগ্রেসে রকার কর্তৃক প্রণীত দশ দফার দলিল ‘বিপ্লবী সিন্ডিক্যালিজমের নীতি’ (Principles of Revolutionary Syndicalism) গৃহীত হয়।

কংগ্রেসের পরবর্তী প্রভাব ও পরিণতি

কংগ্রেসের পরেও NAS-এর অভ্যন্তরে বিতর্ক দীর্ঘকাল ধরে চলতে থাকে। অবশেষে ১৯২৩ সালের মে মাসে একটি গণভোটে, সদস্যরা ৫৩ থেকে ৪৭ শতাংশ ভোটে আরআইএলইউ-এর সাথে অন্তর্ভুক্তির পক্ষে ভোট দেয়। এর ফলে ভিন্নমতাবলম্বীরা দলত্যাগ করেন এবং ‘নেদারল্যান্ডস সিন্ডিক্যালিষ্ট ভ্যাকভার্বন্দ’ (NSV) প্রতিষ্ঠা করেন। তারা NAS সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, “প্রকৃত বিপ্লবী হিসেবে, মুক্তিকামী কমিউনিস্ট হিসেবে এবং সংগঠিত সিন্ডিক্যালিষ্ট হিসেবে আপনাদের কর্তব্য পালন করুন।”

১৯২৩ সালের নভেম্বর নাগাদ NSV এর তেইশ হাজার সদস্যরের মধ্যে NAS আট হাজার সদস্যকে নিজের দিকে টানতে সক্ষম হয় এবং ধাতু শ্রমিক, টেক্সটাইল ও তামাক শ্রমিকদের মধ্যে বড় ধরনের সমর্থন অর্জন করে। বছর শেষের মধ্যে এটি IWA-তে যোগ দেওয়ার পক্ষে ভোট দেয়।

ফ্রান্সে, মনমুসো CGT-U-এর ক্ষমতা দখল করার পর ফরাসি কমিউনিস্ট পার্টি (PCF) CGT-U-এর ভেতরে তাদের নিয়ন্ত্রিত সিন্ডিক্যাল কমিশনের নেটওয়ার্ক বিস্তার করতে শুরু করে। রাজনৈতিক দলের আধিপত্যের বিরোধী এবং স্বায়ত্তাধিকারকামী সদস্যদের মধ্যে এর ফলে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। ১৯২৪ সালের জানুয়ারিতে প্যারিসের রু গ্রাঞ্জ অক্স বেলেসের হাউস অফ ইউনিয়নসে বলশেভিক-কমিউনিস্ট গুণ্ডাদের হাতে পনসেট ও ক্লোস নামক দুই নৈরাজ্যবাদী শ্রমিকের খুন হওয়া পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে। RILU স্বভাবতই PCF-এর পক্ষ নেয়।

এর ফলে ১৯২৬ সালের নভেম্বরে বেসনার ও অন্যান্যদের দ্বারা CGT-SR (CGT-Syndicaliste Revolutionnaire) গঠিত হয়, যা IWA-র সাথে যুক্ত হয়।

FORA-র সমালোচনামূলক অবস্থানের ক্ষেত্রে, ১৯২৩ সালের ডিসেম্বরে IWA-র ইন্সব্রুক কংগ্রেসে ‘বিপ্লবী ঐক্য’ বিষয়ক প্রস্তাবটি বাতিল হওয়ার পর IWA-র সাথে যুক্ত হওয়া নিয়ে তাদের সমস্ত সন্দেহ দূর হয়ে যায়। ফ্রান্সে CDS-এর যে ক্ষতি হয়েছিল, তাতেও তারা নিজেদের সঠিক বলে মনে করেছিল, যা তাদের কাছে তাদের সতর্কবাণীকে নিশ্চিত করেছে বলে মনে হয়েছিল।

১৯২৩ ও ১৯২৪ সালের মধ্যে মেক্সিকান CGT, উরুগুয়ান FORU এবং চিলিয়ান IWA-এর সাথে যুক্ত হয় এবং পরবর্তী সময়ে ব্রাজিল, প্যারাগুয়ে এবং মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার অন্যান্য দেশের সিন্ডিক্যালিষ্ট ইউনিয়নগুলোও এতে যোগ দেয়। জাপানি একটি সংস্থাও এতে যুক্ত হয়েছিল। উত্তর আমেরিকার IWA-এর ক্ষেত্রে কেবল এর মেরিন ট্রান্সপোর্ট ওয়ার্কার্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইউনিয়ন যুক্ত হয়েছিল। বার্লিন কংগ্রেসের বিষয়ে IWW নিরপেক্ষ অবস্থান গ্রহণ করেছিল এবং জানিয়েছিল যে তারা RILU বা IWA কোনোটার সাথেই যুক্ত হবে না।

১৯২৩ সাল থেকে একত্রিশটি দেশে আইডব্লিউএ-এর সহযোগী সংগঠন ছিল। তবে, শীঘ্রই আইডব্লিউএ-এর সহযোগী সংগঠনগুলোর ওপর দমনপীড়ন শুরু হয়।

১৯২২ থেকে ১৯২৪ সালের মধ্যে মুসোলিনি সরকার ইউএসআই-কে ধ্বংস করে দেয়। ব্যাপক সদস্যসমৃদ্ধ পর্তুগিজ CGT ১৯২৬ সালে নিষিদ্ধ হয় এবং ১৯৩৪ সালের মধ্যে প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। FAUD ১৯২৩ থেকে ১৯৩৩ সালের মধ্যে বহু সদস্য হারায় এবং পরবর্তীতে নাৎসিদের দ্বারা ধ্বংস হয়। CGT-SR একটি সংখ্যালঘু ইউনিয়ন হিসেবে রয়ে যায় এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সাথে সাথেই বিলীন হয়ে যায়। ল্যাটিন আমেরিকায়, সামরিক অভ্যুত্থানের পর ১৯৩০ সালের পর থেকে FORA নিষিদ্ধ হয়। মেক্সিকান CGT ১৯২৮ সালের পর থেকে ক্রমশ সংস্কারপন্থি রূপ নেয়।

তা সত্ত্বেও, ১৯২২ সালের কংগ্রেস বিপ্লবী সিন্ডিক্যালিজমের পক্ষে এর দৃঢ় অবস্থান, শ্রেণি সংগ্রামের স্বীকৃতি, মুক্ত কমিউনিজমের ঘোষণা এবং কমিউনিস্ট পার্টির আধিপত্যের বিরুদ্ধে এর প্রতিরোধমূলক ভূমিকার কারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

উল্লেখ্য যে, আইডব্লিউএ-এর প্রতিষ্ঠাতা কংগ্রেস থেকে উদ্ভূত মূল বক্তব্যগুলিতে নৈরাজ্য-সিন্ডিকালিজমের পরিবর্তে বিপ্লবী সিন্ডিকালিজমের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। ‘অ্যানার্কো-সিন্ডিক্যালিজম’ বা নৈরাজ্য–শ্রমিক সংঘবাদ শব্দটা তখন সেভাবে প্রচলিত ছিল না। এটি মূলত জুল গেসদের নেতৃত্বাধীন সংস্কারবাদী সমাজতন্ত্রীদের দ্বারা একটি নিন্দাসূচক শব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই বলশেভিকরা এই শব্দটি নিন্দাসূচক অর্থে এর ব্যবহার অব্যাহত রাখে। অবশেষে ফ্রান্সের বিপ্লবী সিন্ডিকালিস্ট সংখ্যালঘু গোষ্ঠী এটিকে নিজেদের পরিচয় হিসেবে পুনরায় গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেয়, যদিও পিয়ের বেসনার্ড ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত এই শব্দটি ব্যবহারে অনিচ্ছুক ছিলেন।

তা সত্ত্বেও, IWA-কে একটি রাষ্ট্রহীন—শ্রমিক সংঘ (অ্যানার্কো-সিন্ডিক্যালিষ্ট) সংগঠন হিসেবে বর্ণনা করা যায় এবং IWA-র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই বিশ্বমঞ্চে অ্যানার্কো-সিন্ডিক্যালিজম একটি ধারা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল।

তথ্যসূত্র (References):

  • Baer, James A. — Anarchist Immigrants in Spain and Argentina. University of Illinois Press.
  • Damier, Vadim. — Anarcho-syndicalism in the 20th century. Black Cat Press.
  • Guinchard, Francois. — The birth of an international Anarcho syndicalist current. Workers of the World: International Journal on Strikes and Social Conflicts, Volume I, Number 4.
  • Thorpe, Wayne. — Revolutionary syndicalist internationalism 1913–1923: the origins of the International Working Men’s Association (1989 Thesis).
  • Tosstorf, Reiner. — “Mission Impossible: Angel Pestana’s encounter as CNT delegate with the Bolshevik Revolution in 1920”. In: David Berry and Constance Bantman (Eds.), New Perspectives on Anarchism, Labour, and Syndicalism: The Individual, the National and the Transnational. Cambridge Scholars Publishing.